আইসিটি খাতে ৪ হাজার ২১১ কোটি টাকার ‘রাজনৈতিক লুটপাট’: শ্বেতপত্রে আওয়ামী আমলের ভয়াবহ চিত্র
প্রতিবেদকের নাম: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ডিজিটাল বাংলাদেশের আড়ালে গত দেড় দশকে দেশে চলেছে লুটপাটের মহোৎসব। রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাট করে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের গুণগানে ব্যয় করা হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৭২ পৃষ্ঠার এক শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে আইসিটি খাতের দুর্নীতির লোমহর্ষক সব তথ্য। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি, ২০২৬) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব ও ‘মুজিব ভাই’ চলচ্চিত্রের মতো রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কাজে ব্যয় করা হয়েছে ৪ হাজার ২১১ কোটি ২২ লাখ টাকা।
শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ‘মুজিব ভাই’ চলচ্চিত্র নির্মাণেই নয়, ‘খোকা’ সিনেমা নির্মাণের নামেও হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ১৬ কোটি টাকা। আইসিটি অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এবং হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের একাধিক প্রকল্পে স্বজনপ্রীতি ও সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে এই অর্থ লুটপাট করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশাল অংকের ব্যয় কি দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোনো কাঠামোগত উন্নয়ন করেছে, নাকি এটি ছিল কেবলই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইমেজ নির্মাণের হাতিয়ার?
প্রতিবেদনে ১৩টি অধ্যায়ে আইসিটি খাতের অরাজকতা তুলে ধরা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বাস্তব চাহিদা ছাড়াই হাই-টেক পার্ক ও আইটি ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোই এখন পরিত্যক্ত। কোথাও প্রশিক্ষক নেই, কোথাও নেই প্রশিক্ষণার্থী—অথচ বিল তোলা হয়েছে শতভাগ।
বিশেষ করে লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টে (এলইডিপি) জালিয়াতির চিত্র ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। একই ব্যক্তিকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষক দেখিয়ে এবং ভুয়া সনদ বিতরণ করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এমনকি ল্যাপটপ বিতরণের ক্ষেত্রেও দেখা হতো প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়। 'আওয়ামীবিরোধী নন'—এমন নিশ্চয়তা পেলেই কেবল ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্পের আওতায় ল্যাপটপ দেওয়া হতো।
বাঙালির রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাসে ১৯০০ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। তবে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত করার অপচেষ্টাও লক্ষ্য করা গেছে। ১৯৭৮ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠা এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পর দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরলেও গত ১৫ বছরে 'ফ্যাসিবাদী' শাসন ব্যবস্থার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের মুখে পড়ে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই লুটপাটের শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সাল জুড়ে চলা তদন্তের পর ২০২৬ সালের শুরুতে এই প্রতিবেদন প্রকাশকে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি প্রমাণ করেছে যে, উন্নয়নের নামে কীভাবে জনগণের করের টাকা অপচয় করা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও একটি শঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আইনি ব্যবস্থা ছাড়া এই শ্বেতপত্রও অতীতের মতো কেবল ‘ফাইলবন্দি দলিল’ হয়ে থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে।”
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ চায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। ১৯০০ সালের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে ২০২৪-এর ছাত্র অভ্যুত্থান—সব লড়াইয়ের মূল লক্ষ্যই ছিল শোষণমুক্ত সমাজ। শ্বেতপত্রের এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা না গেলে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সূত্র: ১. অর্থনীতিবিদ ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন শ্বেতপত্র কমিটি রিপোর্ট (২০২৬)। ২. যুগান্তর অনলাইন ও টিআইবি-এর বিশেষ বিশ্লেষণ। ৩. বাংলাদেশ প্রতিদিন আর্কাইভ ও সরকারি তথ্য বাতায়ন।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |