| বঙ্গাব্দ

১১ দলীয় জোটের আসন সংকট: ২০২৬-এর নির্বাচনে জামায়াত ও শরিকদের দরকষাকষি

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 02-01-2026 ইং
  • 3219231 বার পঠিত
১১ দলীয় জোটের আসন সংকট: ২০২৬-এর নির্বাচনে জামায়াত ও শরিকদের দরকষাকষি
ছবির ক্যাপশন: ১১ দলীয় জোটের আসন সংকট

আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জোট রাজনীতির বিবর্তন ও বর্তমান ১১ দলীয় জোটের অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে 'বাংলাদেশ প্রতিদিন' পাঠকদের জন্য একটি বিশেষ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন নিচে প্রস্তুত করে দেওয়া হলো:


১১ দলীয় জোটে আসন ভাগাভাগি নিয়ে টানাপোড়েন: বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে জামায়াত ও শরিকরা

প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় নির্বাচনী জোট এখন অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে। ‘একক ব্যালট বাক্স’ আর ‘ইসলামী ঐক্য’র বার্তা নিয়ে জোট গঠিত হলেও ৩০০ আসনে ৬০০-এর বেশি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা পড়ায় আসন সমঝোতা নিয়ে অস্বস্তি চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে দরকষাকষি এখন জটিল আকার ধারণ করেছে, যা জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে জনমনে নানা জল্পনার জন্ম দিচ্ছে।

গত রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ১১ দলীয় জোটের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। জোটে জামায়াত ছাড়াও রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, এলডিপি, এবি পার্টি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো দলগুলো।

পরিসংখ্যানের লড়াই: কার পাল্লা কত ভারী?

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৩০০০ আসনে ২,৫৮২টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরাই জমা দিয়েছেন ৬০০-এর বেশি। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ২৭৬টি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এছাড়া খেলাফত মজলিস ৯৪টি, এবি পার্টি ৫৩টি এবং এনসিপি ৪৪টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।

সূত্র মতে, জামায়াত তার শরিকদের জন্য ১১০টি আসন ছাড়ার প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছে। যেখানে ইসলামী আন্দোলনকে ৩০টি এবং এনসিপিকে ৩০টি আসন দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অন্তত ৭০টি আসনের দাবিতে অনড় রয়েছে, যা নিয়ে জোটের ভেতরে বর্তমানে অচলাবস্থা বিরাজ করছে।

১৯০০ থেকে ২০২৬: জোট রাজনীতির ঐতিহাসিক বিবর্তন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জোট গঠন এবং আসন ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব কোনো নতুন ঘটনা নয়। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই ধারাটি বিভিন্ন রূপে প্রবাহিত হয়েছে:

  • ১৯০০ - ১৯৪৭ (ব্রিটিশ আমল): ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন মুসলিম রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ঐক্যের চেষ্টা চলেছে। বিশেষ করে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগের মধ্যে জোট গঠনের প্রক্রিয়াটি ছিল সমসাময়িক রাজনীতির বড় দিক।

  • ১৯৫৪ - যুক্তফ্রন্ট গঠন: পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসে জোট রাজনীতির সবচেয়ে সফল উদাহরণ ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে শেরে বাংলা, ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর সেই ঐক্য ছিল বাঙালির স্বাধিকারের প্রথম সোপান। তবে নির্বাচনের পরেই আসন ও ক্ষমতা ভাগাভাগি নিয়ে সেই জোটে ফাটল ধরেছিল।

  • ১৯৯১ - ২০০৬ (বিএনপি-জামায়াত ও ৪ দলীয় জোট): নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালে বিএনপি-জামায়াত অপ্রাতিষ্ঠানিক সমঝোতা এবং পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে ‘৪ দলীয় জোট’ গঠন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ আনে। ২০০১ সালে এই জোট বিশাল জয় পায়।

  • ২০২৪ - ২০২৬ (নতুন প্রেক্ষাপট): ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত আলাদাভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। জামায়াত এখন তার নেতৃত্বে ইসলামী ও সমমনা দলগুলোকে নিয়ে ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করছে। ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া সাম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িক জোটের এই লড়াই ২০২৬ সালে এসে নতুন এক সমীকরণে দাঁড়িয়েছে।

নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও অভ্যন্তরীণ সংকট

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক মনে করেন, সমঝোতা না হলে কিছু আসন ‘উন্মুক্ত’ রাখা হতে পারে। অন্যদিকে, ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন বলেন, "আসন সমঝোতা হতে হবে ইনসাফের ভিত্তিতে।"

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তাদের শীর্ষ ৮ নেতার আসন মোটামুটি নিশ্চিত হলেও বাকি ৩৬ জন প্রার্থী এখনও অন্ধকারে। এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু জানিয়েছেন, মাত্র ৩টি আসনের প্রাথমিক প্রস্তাবে তারা সন্তুষ্ট নন এবং জোটে থাকা না থাকা নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে।

একনজরে ১১ দলীয় জোটের মনোনয়নপত্র জমা (২০২৬)

দলের নামসংগৃহীত/জমা দেওয়া আসনজোটের প্রস্তাবিত আসন (প্রাথমিক)
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী২৭৬১৯০
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ২৬৮৩০-৪০
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস৯৪১০
এবি পার্টি৫৩
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)৪৪৩০

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. স ম আলী রেজার মতে, এটি একটি ‘বারগেনিং গেম’। ১৯ তারিখের মধ্যে যদি এই সংকট নিরসন না হয়, তবে ২০ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে জোটের অনেক সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে। ১৯০০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই ক্ষমতার লড়াই ২০২৬ সালে এসে আবারও প্রমাণ করছে যে, নির্বাচনী জোটে আদর্শের চেয়ে কৌশলই বেশি প্রাধান্য পায়।


সূত্র: ১. নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের মনোনয়নপত্র সংক্রান্ত সর্বশেষ আপডেট।

২. ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিং ও দলীয় ইশতেহার।

৩. বাংলাদেশের জোট রাজনীতির ইতিহাস (১৯০০-২০২৬): বিডিএস ফ্যাক্ট চেকিং উইং।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুনবাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency