প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
ঢাকা, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর বর্বরোচিত হামলা এবং খাদ্য বিভাগে বিশাল দুর্নীতির সিন্ডিকেট চালানোর দায়ে অবশেষে ধরা পড়লেন দিনাজপুর কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগারের (সিএসডি) সহকারী ব্যবস্থাপক মো. দেলোয়ার হোসেন। আজ সোমবার খাদ্য অধিদপ্তর তাকে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে। দেলোয়ার হোসেন ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তার কুখ্যাত ‘সাধন সিন্ডিকেট’-এর অন্যতম প্রধান হোতা হিসেবে পরিচিত।
সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সম্প্রতি পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হন। আজ তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আবুল হাছানাত হুমায়ূন কবীর বরখাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার হওয়া কর্মচারীকে বরখাস্ত করতে হয়। তবে এসব অপরাধীরা কীভাবে এতদিন গুরুত্বপূর্ণ পদে টিকে ছিল, তা বড় প্রশ্ন। তাদের পেছনে অধিদপ্তরের ভেতরেও গডফাদার রয়েছে।’
দেলোয়ার হোসেনের এই পতন মূলত বাংলাদেশের দীর্ঘ ৭৫ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি নির্দেশ করে। ১৯৫০ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির আদর্শিক বিচ্যুতি এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির শেকড় অনেক গভীরে।
১৯৫০-১৯৫২ (আদর্শিক সূচনা): ১৯৫০-এর দশকে ছাত্র রাজনীতি ছিল অধিকার আদায়ের প্রধান হাতিয়ার। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে ছাত্ররাই ছিল মূল শক্তি। তখনকার ছাত্রনেতারা ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
১৯৭১-১৯৯০ (ক্ষমতার রাজনীতির পালাবদল): স্বাধীনতার পর এবং বিশেষ করে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্র সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি শুরু করে। এই সময়েই প্রশাসনে রাজনৈতিক ক্যাডারদের প্রবেশের ‘কালচার’ তৈরি হয়।
২০০৮-২০২৪ (সিন্ডিকেট রাজের উত্থান): গত দেড় দশকে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে। দেলোয়ার হোসেনের মতো ব্যক্তিরা যারা ছাত্রজীবনে কিশোরগঞ্জের গোবরিয়া আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তারা মন্ত্রীর প্রশ্রয়ে বিশাল ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন।
২০২৪-২০২৫ (জুলাই বিপ্লব ও সংস্কার): ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এই দীর্ঘদিনের কুক্ষিগত ক্ষমতা ও সিন্ডিকেট রাজের অবসান ঘটায়। ২০২৫-এর এই বিচার প্রক্রিয়া মূলত সেই ১৯৫০ সাল থেকে চলে আসা ছাত্র রাজনীতির কলঙ্ক মোচনের একটি পদক্ষেপ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের ভাতিজা রাজেশ মজুমদার ছিলেন এই সিন্ডিকেটের প্রধান সমন্বয়ক। মন্ত্রীর পিএস আবু নাসের বেগ, ছোট মেয়ে তৃণা মজুমদার এবং ভাই মনা মজুমদারসহ একটি চক্র বেইলি রোডের সরকারি বাসায় বসে খাদ্য বিভাগের বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণ করতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সেই বাসায় চলত কোটি টাকার লেনদেন। দেলোয়ার হোসেন ছিলেন দিনাজপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য অঞ্চলের দায়িত্বে থেকে এই বাণিজ্যের অন্যতম সহযোগী। জুলাই বিপ্লবের পর অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা ম্যানেজ করে স্বপদে বহাল থাকার চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৫০ সাল থেকে ২০২৫ সালের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র বারবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। দেলোয়ারের বরখাস্ত হওয়া শুধুমাত্র একজন কর্মকর্তার পতন নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে প্রশাসনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ‘ফ্যাসিস্ট দোসরদের’ শিকড় উপড়ে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এই সিন্ডিকেটের বাকি সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনা না গেলে সংস্কার পূর্ণতা পাবে না।
সূত্র: ১. খাদ্য অধিদপ্তর (DGF) কেন্দ্রীয় প্রেস বিজ্ঞপ্তি (২৯ ডিসেম্বর ২০২৫)। ২. কালের কণ্ঠ ও যুগান্তর অনলাইন আর্কাইভ (তদন্ত প্রতিবেদন ও পুলিশের বক্তব্য)। ৩. বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দলিল (১৯৫০-২০২৫) ও গুগল নিউজ এনালাইসিস।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |